মদিনার ইতিহাস (History of Madinah)
রাসূলুল্লাহ (সা.) এর শহর
মোট 8টি বিভাগ
মদিনার পরিচিতি
মদিনা (আরবি: المدينة المنورة) হল ইসলামের দ্বিতীয় পবিত্র শহর এবং সৌদি আরবের হেজাজ অঞ্চলের একটি শহর। এটি রাসূলুল্লাহ (সা.) এর মসজিদ (মসজিদে নববী) এর অবস্থান এবং ইসলামের প্রথম রাজধানী।
মদিনার ঐতিহাসিক নাম
ইয়াসরিব
ইসলামের আগে মদিনা "ইয়াসরিব" নামে পরিচিত ছিল।
মদিনাতুন নবী
রাসূলুল্লাহ (সা.) এর হিজরতের পর শহরটি "মদিনাতুন নবী" (নবীর শহর) নামে পরিচিত হয়।
তায়্যিবা
মদিনার আরেকটি নাম হল "তায়্যিবা" যার অর্থ পবিত্র বা সুন্দর।
হিজরত ও মদিনায় ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা
হিজরত (৬২২ খ্রিস্টাব্দ)
রাসূলুল্লাহ (সা.) মক্কার কুরাইশদের নির্যাতন থেকে বাঁচতে মদিনায় হিজরত করেন। এই ঘটনা ইসলামি বর্ষপঞ্জির (হিজরি) সূচনা করে।
মুহাজির ও আনসার
মক্কা থেকে আসা মুসলমানদের "মুহাজির" এবং মদিনার স্থানীয় মুসলমানদের "আনসার" বলা হয়। আনসাররা মুহাজিরদের সাহায্য করেছিলেন।
মদিনা সনদ
রাসূলুল্লাহ (সা.) মদিনায় একটি লিখিত সনদ তৈরি করেন যা বিভিন্ন গোত্র ও ধর্মের মানুষের মধ্যে শান্তি ও সহাবস্থান নিশ্চিত করে।
মসজিদে নববীর ইতিহাস (Masjid al-Nabawi)
প্রাথমিক নির্মাণ (৬২২ খ্রিস্টাব্দ)
রাসূলুল্লাহ (সা.) মদিনায় হিজরত করার পর, তিনি যে স্থানে তাঁর উট বসেছিল সেখানেই মসজিদে নববী নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন। এই জমিটি দুই এতিম বালকের ছিল, যাদের অভিভাবক ছিলেন আসাদ ইবনে যুরারা (রা.)। রাসূলুল্লাহ (সা.) জমিটি ক্রয় করেন এবং সাহাবীদের সাথে মিলে মসজিদ নির্মাণ শুরু করেন।
নির্মাণের বৈশিষ্ট্য
প্রাথমিক মসজিদটি ছিল খুবই সরল ও সাধারণ। এটি ছিল প্রায় ৩০ মিটার × ৩৫ মিটার আয়তনের। দেওয়াল ছিল কাদামাটি ও পাথর দিয়ে তৈরি, ছাদ ছিল খেজুর গাছের ডাল দিয়ে এবং মেঝে ছিল বালু দিয়ে ঢাকা।
মিহরাব ও মিম্বর
প্রাথমিক মসজিদে মিহরাব (প্রার্থনার নির্দেশক স্থান) ছিল না। রাসূলুল্লাহ (সা.) একটি খেজুর গাছের গুঁড়ি ব্যবহার করতেন যার দিকে মুখ করে নামাজ পড়তেন। পরবর্তীতে একটি মিম্বর (বক্তৃতার স্থান) তৈরি করা হয়।
প্রথম সম্প্রসারণ (৬২৮ খ্রিস্টাব্দ)
রাসূলুল্লাহ (সা.) এর জীবদ্দশায় মসজিদটি প্রথমবার সম্প্রসারণ করা হয়। খাইবার যুদ্ধের পর বিজয়ের সম্পদ দিয়ে মসজিদের আকার বৃদ্ধি করা হয়।
রওজা শরীফ
রাসূলুল্লাহ (সা.) এর ওফাতের পর, তিনি মসজিদের অভ্যন্তরে তাঁর নিজের ঘরে সমাহিত হন। এই স্থানটি "রওজা শরীফ" নামে পরিচিত। হযরত আবু বকর (রা.) ও হযরত উমর (রা.) এর কবরও এখানে অবস্থিত।
খলিফাদের সময় সম্প্রসারণ
হযরত উমর (রা.) এর সময় (৬৩৪-৬৪৪ খ্রিস্টাব্দ): প্রথম খলিফা হযরত উমর (রা.) মসজিদটি সম্প্রসারণ করেন এবং এর চারপাশে দেওয়াল নির্মাণ করেন।
হযরত উসমান (রা.) এর সময় (৬৪৪-৬৫৬ খ্রিস্টাব্দ): তৃতীয় খলিফা হযরত উসমান (রা.) মসজিদের ছাদ পাথর দিয়ে শক্তিশালী করেন এবং মিহরাব নির্মাণ করেন।
উমাইয়া ও আব্বাসীয় যুগ
ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালিক (৭০৫-৭১৫ খ্রিস্টাব্দ): উমাইয়া খলিফা ওয়ালিদ মসজিদটি ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ করেন এবং এটি সোনা ও মোজাইক দিয়ে সাজান।
মাহদী (৭৭৫-৭৮৫ খ্রিস্টাব্দ): আব্বাসীয় খলিফা মাহদী মসজিদের উত্তর দিক সম্প্রসারণ করেন।
মামলুক ও উসমানীয় যুগ
মামলুক সুলতানরা (১২৫০-১৫১৭ খ্রিস্টাব্দ): মামলুক সুলতানরা মসজিদের বিভিন্ন অংশ সংস্কার ও সম্প্রসারণ করেন।
উসমানীয় সুলতানরা (১৫১৭-১৯১৮ খ্রিস্টাব্দ): উসমানীয় সুলতানরা, বিশেষ করে সুলতান আবদুল মজিদ (১৮৩৯-১৮৬১), মসজিদটি ব্যাপকভাবে সংস্কার করেন এবং এর গম্বুজ ও মিনার নির্মাণ করেন।
সৌদি আরবের সময় (১৯২৫-বর্তমান)
সৌদি রাজা আবদুল আজিজ (১৯২৫-১৯৫৩): সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা রাজা আবদুল আজিজ মসজিদের প্রথম বড় সম্প্রসারণ শুরু করেন।
রাজা ফাহাদ (১৯৮২-২০০৫): রাজা ফাহাদের সময় মসজিদটি সবচেয়ে বড় সম্প্রসারণ করা হয়। নতুন অংশে ২৭টি গম্বুজ, ৬টি নতুন মিনার এবং আধুনিক সুযোগ-সুবিধা যোগ করা হয়।
রাজা আবদুল্লাহ (২০০৫-২০১৫): রাজা আবদুল্লাহর সময় আরও সম্প্রসারণ করা হয় এবং "রিয়াদ আল জান্নাহ" (জান্নাতের বাগান) নামে একটি বিশেষ অংশ তৈরি করা হয়।
রাজা সালমান (২০১৫-বর্তমান): রাজা সালমানের সময় "মাশায়ার মুকাররামাহ" প্রকল্পের মাধ্যমে মসজিদের আরও সম্প্রসারণ করা হয়েছে।
বর্তমান অবস্থা
বর্তমানে মসজিদে নববী বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম মসজিদ। এটি প্রায় ৪,০০,০০০ বর্গমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এবং একসাথে প্রায় ১০ লক্ষ মুসল্লি নামাজ পড়তে পারেন। মসজিদে আধুনিক শীততাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, স্বয়ংক্রিয় ছাতা, আধুনিক আলোকসজ্জা এবং বিভিন্ন আধুনিক সুযোগ-সুবিধা রয়েছে।
মসজিদে নববীর বিশেষ স্থানসমূহ
- রওজা শরীফ: রাসূলুল্লাহ (সা.), হযরত আবু বকর (রা.) ও হযরত উমর (রা.) এর কবরস্থান
- রিয়াদ আল জান্নাহ: রওজা শরীফ ও মিম্বরের মধ্যবর্তী স্থান, যা জান্নাতের বাগান হিসেবে পরিচিত
- মিম্বর শরীফ: রাসূলুল্লাহ (সা.) এর মিম্বরের স্থান
- মিহরাব: নামাজের দিক নির্দেশক স্থান
- হুজরা শরীফ: রাসূলুল্লাহ (সা.) এর স্ত্রীদের ঘর, যা এখন মসজিদের অংশ
মসজিদে নববীর গুরুত্ব
মসজিদে নববী হল ইসলামের দ্বিতীয় পবিত্রতম মসজিদ (মসজিদুল হারামের পর)। হাদীসে বর্ণিত আছে যে, এই মসজিদে একবার নামাজ পড়লে ৫০,০০০ বার নামাজের সওয়াব পাওয়া যায়। এটি মুসলমানদের জন্য একটি বিশেষ তীর্থস্থান এবং হজ্জ ও উমরাহর পর মদিনা জিয়ারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
মদিনার ঐতিহাসিক ঘটনাবলী
বদরের যুদ্ধ (৬২৪ খ্রিস্টাব্দ)
মদিনার নিকটবর্তী বদর নামক স্থানে মুসলমান ও কুরাইশদের মধ্যে প্রথম বড় যুদ্ধ সংঘটিত হয়। মুসলমানরা বিজয়ী হয়।
উহুদের যুদ্ধ (৬২৫ খ্রিস্টাব্দ)
মদিনার নিকটবর্তী উহুদ পাহাড়ে দ্বিতীয় বড় যুদ্ধ সংঘটিত হয়।
খন্দকের যুদ্ধ (৬২৭ খ্রিস্টাব্দ)
মদিনার চারপাশে খন্দক (পরিখা) খনন করে শহর রক্ষা করা হয়।
হুদাইবিয়ার সন্ধি (৬২৮ খ্রিস্টাব্দ)
মক্কার কুরাইশদের সাথে একটি শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
মক্কা বিজয় (৬৩০ খ্রিস্টাব্দ)
রাসূলুল্লাহ (সা.) মক্কা বিজয় করেন এবং মক্কায় ফিরে আসেন।
মদিনার পবিত্র স্থানসমূহ
মসজিদে নববী
মসজিদে নববী হল রাসূলুল্লাহ (সা.) কর্তৃক নির্মিত মসজিদ এবং তাঁর সমাধি স্থল। এটি ইসলামের দ্বিতীয় পবিত্রতম মসজিদ।
রওজা শরীফ
রাসূলুল্লাহ (সা.) এর সমাধি "রওজা শরীফ" নামে পরিচিত। এটি মসজিদে নববীর অভ্যন্তরে অবস্থিত।
কুবা মসজিদ
কুবা মসজিদ হল ইসলামের প্রথম মসজিদ যা রাসূলুল্লাহ (সা.) মদিনায় হিজরতের সময় নির্মাণ করেন।
কিবলাতাইন মসজিদ
কিবলাতাইন মসজিদ হল সেই স্থান যেখানে কিবলা পরিবর্তনের নির্দেশ আসে (জেরুজালেম থেকে মক্কার দিকে)।
জান্নাতুল বাকি
জান্নাতুল বাকি হল মদিনার একটি কবরস্থান যেখানে অনেক সাহাবী ও রাসূলুল্লাহ (সা.) এর পরিবারের সদস্যদের কবর রয়েছে।
উহুদ পাহাড়
উহুদ পাহাড় হল মদিনার নিকটবর্তী একটি পাহাড় যেখানে উহুদের যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল।
রাসূলুল্লাহ (সা.) এর মদিনায় জীবন
মদিনায় অবস্থানকাল
রাসূলুল্লাহ (সা.) মদিনায় প্রায় ১০ বছর (৬২২-৬৩২ খ্রিস্টাব্দ) অবস্থান করেন। এই সময়ে তিনি ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন এবং ইসলামের বিস্তার ঘটান।
ওফাত (৬৩২ খ্রিস্টাব্দ)
রাসূলুল্লাহ (সা.) ৬৩২ খ্রিস্টাব্দে মদিনায় ইন্তেকাল করেন এবং রওজা শরীফে সমাহিত হন।
মদিনার আধুনিক উন্নয়ন
বর্তমানে মদিনা একটি আধুনিক শহর হিসেবে গড়ে উঠেছে। মসজিদে নববীর সম্প্রসারণ, বিভিন্ন আধুনিক সুযোগ-সুবিধা যোগ করা হয়েছে। তবে শহরের পবিত্রতা ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব অক্ষুণ্ণ রয়েছে।